শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

২৮ অক্টোবরের স্মৃতি রোমন্থন

মোঃ আমান উল্লাহ 

২০০৬ ঈসায়ী সনের ২৮ অক্টোবর, শনিবার। আমি তখন রাজধানী ঢাকার শ্যামলী এলাকায় একটি প্রাইভেট কোম্পানীর হেড অফিসে চাকরিরত ছিলাম। অফিসে কর্মরত অবস্থায় আনুমানিক বেলা ১১টার দিকে সাংগঠনিক সূত্রে খবর পেলাম যথাশীঘ্র পল্টনে যেতে হবে। পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত, সহিংসতা হচ্ছে, তার মোকাবেলা করতে হবে। বিকেলে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেইটে জামায়াতের পূর্ব ঘোষিত কেন্দ্রীয় সমাবেশ। অফিস থেকে একটু আগে-ভাগে ছুটি নিয়ে সেখানে অংশগ্রহণ করব এমন পরিকল্পনা আগেই নিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু জরুরিভাবে খবর আসায় দুপুরের খাবার সেরে সময় মতো যোহর নামায পড়ে দ্রুত অফিস থেকে বের হয়ে পড়ি। শহরের অবস্থা বেশ থমথমে অনুভব করতে পারলাম। বাস ও অন্যান্য যানবাহনের সংখ্যা কম। যে কয়েকটা বাস চলছে তাতে উঠার জো নেই। আমরা মোট ৪ জন একত্রে রওয়ানা দিয়েছিলাম। ২ জন ভাই হুট করে একটি বাসে উঠে পড়লেন। আমি ও আমার সাথের ভাইটি একটি বাসের দরজার পাদানীতে পা দিয়ে উঠলাম কিন্তু আর ভিতরে যেতে পারলাম না। বাসটি মৎস্য ভবন তথা হাইকোর্টের গেইটের কাছে গিয়ে আর যেতে পারল না। ওখান থেকে সকল বাসই ফেরত যাচ্ছে। আমরা সেখানে নেমে পড়ে প্রেস ক্লাব হয়ে পল্টন মোড়ে যাব বলে হাঁটছি। দেখলাম এদিক-সেদিক কিছু মানুষ (?) রয়েছে যাদের হাতে কেবল লগি-বৈঠা। প্রকৃতপক্ষে তখন পর্যন্ত আমরা বাস্তব পরিস্থিতির কিছুই জানি না। জানি না, ইতোমধ্যে শহীদ জসীম উদ্দীনসহ বেশ কয়েকজন ভাইকে প্রকাশ্য দিবালোকে সাপের মতো পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে। কিন্তু না জানলেও মনটা কেন জানি বারবার আঁতকে উঠছিল। আমি বুঝতে পারলাম যে, জামায়াত-শিবিরের ভাইয়েরা পল্টন মোড়ের পূর্ব দিকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেইটে অবস্থান নিয়ে আছেন। পল্টন মোড়ের পশ্চিম দিকসহ বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী-বাকশালী লগি-বৈঠাধারীরা অবস্থান নিয়ে আছে। পরিস্থিতি অনুধাবনের পর আমার শরীরটা ঝিমঝিম করে উঠল। কেননা, আমি পুরোপুরি হিং¯à§à¦° শত্রুদের ভেতরে চলে এসেছি। আমার কপালের দুই পাশের শিরা-উপশিরাগুলো দ্রুত উঠানামা করছিল। কিন্তু আমি কাউকেই বুঝতে দেইনি। মূলত: আমার যে বেশ-ভুষা তাতে দুর্বৃত্তদের কবলে পড়ে যাব কিনা সে কথা ভেবে আমার খেই হারিয়ে ফেলার অবস্থা। এমন সময় প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তায় আমার বড় ভাইয়ের একজন আইনজীবীকে দেখতে পেলাম। দ্রুত তার কাছে গিয়ে হাত মেলালাম এবং প্রয়োজনে তার সাহায্য নেয়া যাবে বলে মনে মনে ঠিক করলাম। ঐ আইনজীবী হাইকোর্টের অন্যতম বিচারপতি। পরবর্তীতে পত্রিকা মারফত জানতে পেরেছিলাম একজন ব্যক্তিকে প্রেস ক্লাবের সামনে পায়ের গোড়ালির উপর প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় দেখতে পেয়ে লগিবৈঠাধারীরা তার উপর আক্রমণ করেছিল। সম্ভবত তিনি পেশায় একজন শিক্ষক ছিলেন। 

অত:পর পল্টন মোড়ের দিকে এগিয়ে গেলাম। তখনই দেখতে পেলাম পাঞ্জাবী-পায়জামা পরিহিত এক তরুণ ভাইকে বিধ্বস্ত অবস্থায় লগি-বৈঠাধারীদের একটি গ্রুপ পশ্চিম দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ঐ ভাইটির কী পরিণতি হয়েছিল আমি জানি না। এ সময় আমার সঙ্গীটি উচ্চস্বরে বলে উঠল- ‘এই এলাকার সবাই দেখছি লগি-বৈঠাধারী’। আমি তখন তার সাথে চলা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে হঠাৎ করেই তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। পল্টন মোড়ে এসে পরিষ্কার বুঝতে পারলাম মোড়ের যে পাশে আমি দাড়িয়ে আছে তারা সবাই লগি-বৈঠাধারী। পক্ষান্তরে অপর পাশে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীগণ মানব ঢাল রচনা করে দাঁড়িয়ে আছেন। দু’পক্ষ একদম মুখোমুখি অবস্থায় দাঁড়ানো। কিন্তু আমার পক্ষে ঐ পাশে যাওয়ার মতো কোন সুযোগ নেই। এমতাবস্থায় কী করব মাথায় কিছুই আসছে না। এমন সময় দেখি তাদের মুক্তাঙ্গনের অবস্থান থেকে হাজী মকবুল (ধানমন্ডি, মোঃ পুর এলাকার সাবেক এমপি) তার দলবল নিয়ে নিজ এলাকায় ফেরত যাচ্ছেন। হাজী মকবুুলসহ তার গ্রুপে আরো ২/à§§ জন ছোট ছোট দাড়ি বিশিষ্ট লোক দেখতে পেলাম। একটুখানি ভেবে নিয়ে সেই গ্রুপে নিজেকে যুক্ত করে তাদের সাথে হাঁটতে থাকলাম। তারা যখন কেন্দ্রীয় ঈদগাহের কদম ফুল ফোয়ারা পর্যন্ত আসল তখন আমার ভাবনায় আসল যে তাদের সাথে আমি কোন পর্যন্ত যাব? সেই পর্যন্ত আমি তাদের সাথে এডজাস্ট করতে পারব নাকি কোন অনভিপ্রেত অবস্থার মধ্যে পড়ে যাব? এই ভাবনার মধ্যেই তাদের নিকট থেকে একটু কায়দা করে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রেস ক্লাবের উল্টোদিকের রাস্তা দিয়ে সেগুনবাগিচা হয়ে কাকরাইল অত:পর নয়াপল্টনের দিকে হাঁটতে থাকলাম। তবে সেগুনবাগিচা এলাকাতেও বিচ্ছিন্ন ২/à§§ জন লগিবৈঠাধারী দেখতে পেলাম। 

যা হোক, আমি উদ্দেশ্য ঠিক করলাম নয়াপল্টন, পানির ট্যাংকি-ফকিরাপুল-দৈনিক বাংলা মোড় দিয়ে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেইটের সমাবেশে যোগ দিব। কিন্তু নয়াপল্টনে বিএনপি তখন তাদের সমাবেশ করছিল। সমাবেশের মঞ্চটা এমনভাবে করা ছিল যে, ফকিরাপুলের যাওয়ার কোন সুযোগ পাইনি। অগত্যা ভেতরের অলিগলি দিয়ে হেঁটে পল্টনস্থ জামায়াত অফিসের পিছনের এলাকায় আসতেই নজরে পড়ল জামায়াত কর্মীদের একটি গ্রুপ থেকে থেকে নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার শ্লোগান দিচ্ছে। আমি যতটুকো বুঝলাম তাদের উদ্দেশ্য ছিল পিছনের কোন গলি দিয়ে যাতে শত্রুপক্ষ ঢুকে পড়তে না পারে। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম এবং ভাবতে থাকলাম এই গ্রুপে যোগ দিব কি না? একটুখানি মুশকিল হলো আমি তাদের কাউকে চিনি না। জোট সরকারের শাসনামলে তিন বৎসর আমি মহানগর অফিসের একজন অফিস স্টাফ হিসেবে কাজ করেছি। সেই সুবাদে কেন্দ্রীয়, মহানগর, মহানগরের প্রত্যেকটি থানা এমনকি ওয়ার্ড সভাপতিদের নাম পর্যন্ত আমার জানা ছিল। এটা ছিল আমার দায়িত্বের সংশ্লিষ্ট বিষয়। সেই প্রেক্ষিতে আমি যখন তাদের কাউকে চিনতে পারলাম না এবং আমাকে চেনার কোন লক্ষণ তাদের মাঝে দেখলাম না তখন আমি আবার দৈনিক বাংলা মোড়ের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। ফকিরাপুল পানির ট্যাংকির মোড়ে এসে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে থাকলাম। কিন্তু আমি কোন কিছুই আঁচ করতে পারছিলাম না যে, আমাদের ভাইয়েরা কিভাবে-কোন কৌশলে অবস্থান নিয়ে আছেন? শত্রুপক্ষের অবস্থান কতটুকো দূরত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমি তখন মেইন রোডের সমান্তরাল একটু ভেতরের রাস্তা ধরে ফকিরাপুল হয়ে পূর্বদিকে চললাম। অত:পর প্রায় শাপলা চত্বরের কাছাকাছি গিয়ে আবার মেইন রোড দিয়ে দৈনিক বাংলা মোড়ের দিকে চলে আসছি। সে সময় আমার কাছে সমাবেশ দৃষ্টিগোচর হল এবং আসরের নামাযের ঘোষণাও শুনতে পেলাম। ঘোষণা দিচ্ছিলেন মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। আমি তখন দ্রুততার সাথে এসে নামায পড়লাম। যদ্দূর মনে পড়ে নামাযের জামায়াতের ইমামতি করেছিলেন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। নামায শেষ হবার সাথে সাথেই আবার সমাবেশ শুরু হলো। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন আমীরে জামায়াত, সেক্রেটারি জেনারেল ও আল্লামা সাঈদীসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতৃবৃন্দ। আমি তাদেরকে একনজর দেখে যেদিকে যাওয়ার জন্য আমার এত পথ পেরিয়ে আসা সেই পল্টন মোড়ের দিকে চলে আসলাম। এসে দেখি এক ভয়াবহ যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে এখানে। পরিচিত ২/à§§ জনের সাথে দেখা হল। তারা আমাকে বিভিন্নভাবে উদ্বুদ্ধ করলেন। শত্রুপক্ষ পল্টন মোড়ের পশ্চিম দিক, প্রেস ক্লাব, বিজয় নগরের রাস্তা, মুক্তাঙ্গন এবং বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ অফিস পর্যন্ত সবদিকে ওত পেতে আছে জামায়াতের সমাবেশকে ভন্ডুল করত: জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে চিরতরে খতম করে দেয়ার জন্য। লক্ষ্য করলাম লগিবৈঠাধারীরা পল্টন মোড় থেকে কিছু সময় পর পর পিস্তলের গুলী ছুড়ছে। প্রত্যক্ষ করলাম আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের এক অকুতোভয় সৈনিক শফিকুল ইসলাম মাসুদ ভাই এক হাতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েও রাস্তার মাঝখানে আইল্যান্ডের উপর সর্বসম্মুখে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব প্রদান করছেন। একের পর এক ভাইয়েরা আহত হচ্ছেন এবং তাদেরকে মহানগর অফিসে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অন্য ভাইয়েরা মোকাবেলা করার জন্য যথাসাধ্য লড়ে যাচ্ছেন। আমার à§«/à§­ হাত অদূরে কয়েকটি গুলী ছুড়ে আসতে দেখলাম। এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও একটি ঘটনা লক্ষ্য করলাম যা আমি ভুলতে পারি না। সেটি হচ্ছে কিশোর বয়সের এক শিবির কর্মী এই পরিস্থিতিতে এক প্যাকেট বিস্কুট হাতে নিয়ে বিতরণ করছে। আমার মনে হল তার মনে ভয়-দুশ্চিন্তা বলতে কোন কিছু নেই। ছেলেটির চেহারা আমার একদম মনে নেই কিন্তু ঘটনাটি আমার বারবার মনে পড়ে। একটু পর আমীরে জামায়াতের বক্তব্য চলাকালীন পল্টন মোড়ের পূর্ব-দক্ষিণ দিকের একটি নির্মাণাধীন বিল্ডিং থেকে সমাবেশ স্থলের দিকে পর পর অনেকগুলো গ্র্যানেড বিস্ফোরিত হল। কিন্তু গ্র্যানেডের বিকট আওয়াজ ভয়ের পরিবর্তে আমাদের মনের জিহাদী স্পৃহাকে যেন আরও উত্তপ্ত করে তুলেছিল। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অশেষ রহমতে সেদিন নেতৃবৃন্দের কোন ক্ষতি সাধিত হয়নি। জামায়াত-শিবিরের উপস্থিত নেতা-কর্মীগণ কেবলমাত্র সেগুন কাঠের লাঠি হাতে মানব ঢাল রচনা করে সেদিন যে ঈমানী জযবার পরিচয় দিয়েছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে তা লিখা হোক বা না হোক, আলিমুল গায়েবের দপ্তরে অবশ্যই সোনার হরফে লিখা হয়ে থাকবে। আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে সেগুন কাঠের কিছু লাঠি প্রদর্শন করাতে সশস্ত্র আওয়ামী ক্যাডাররা সমাবেশে আক্রমণ করার সাহস পায়নি।   à¦¯à¦¾ হোক, অবশেষে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসল। চারদিকে একদম ভূতুড়ে অবস্থা। হঠাৎ করে এমন ভূতুড়ে অবস্থা কিভাবে সৃষ্টি হলো আমি কোনক্রমেই বুঝে উঠতে পারিনি। এ পর্যায়ে আমি অনেকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। অন্যদের অবস্থাও তথৈবচ। মসজিদে মাগরিবের নামাযের সময় পেরিয়ে গেছে। আমার হাতে কোন মোবাইল নেই, ঘুটঘুটে অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থা, দায়িত্বশীলদের অনেককেই দেখতে পাচ্ছি না, সর্বোপরি শত্রুপক্ষের তৎপরতা ও গতিবিধি ঠাওর করতে পারছি না। এমতাবস্থায় একটু দূরে গিয়ে কোন মসজিদে নামায আদায় করার মনস্থির করে দৈনিক বাংলা মোড় হয়ে উত্তর দিক দিয়ে যে পথে এসেছিলাম অনেকটা সে পথে কাকরাইলের দিকে চললাম। কাকরাইল মোড়ে এসে নিজেকে নিরাপদ অনুভব করতে পারলাম না। যানবাহন একদম কম। দ্রুত একটি রিক্সায় চড়ে শান্তিনগর মোড়ে পৌঁছে আবার হাঁটতে থাকলাম। এখানে আসার পর রাস্তাÑঘাটের একটু স্বাভাবিক অবস্থা মনে হল। আমার মনে হল যেহেতু মগবাজার ওয়ার্লেস রেলগেইট এলাকায় জামায়াতের কেন্দ্রীয় অফিস তাই ওখানে জামাতÑশিবিরের সংঘবদ্ধ অবস্থান ছিল। শরীর ক্লান্ত এবং ক্ষুধার্ত অবস্থায়ও আমি দ্রুততার সাথে হেঁটে চলছি। 

আমি আজো আফসোস করি আমাদের ভাইদের নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখার জন্য কেন আরো আগে-ভাগে ময়দানে চলে যেতে পারিনি? কেন সুযোগ পেয়েও শত্রুর মোকাবেলায় আরো জোরালো ভূমিকা রাখতে পারিনি? কেন শহীদদের অসমাপ্ত কাজ আঞ্জাম দেবার জন্য নিজেদেরকে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে পারিনি? তবুও মহান রবের নিকট আকুতি জানাই আমাদেরকে ২৮ অক্টোবরের সামান্য কর্মী হিসেবে কবুল করে নিয়ে অসামান্য জান্নাতী নিয়ামত দান করিও। কেননা, আমরা জান্নাতী যুবকদের সর্দার ইমাম হুসাইনের উত্তরসূরী হিসেবে জুলুমের বিরুদ্ধে ঈমানের দাবী পূরণে সামান্য হলেও à¦…ংশগ্রহণ করেছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ